জমি কেনার সময় অনেকেই টাকার দিকে বেশি নজর দিলেও জমির কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেন না, যার ফলে পরবর্তীতে প্রতারণা বা মামলা-মোকদ্দমার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জমি কেনার আগে মালিকানার কাগজপত্র সঠিকভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। অ্যাডভোকেট মোঃ আমির হামজা জমি কেনার আগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন, যা সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।
প্রথম ধাপ: জমির মালিকানার কাগজপত্র দেখা বা ডকুমেন্টেশন
জমি কেনার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বিক্রেতার মালিকানার কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা। আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, বিক্রেতা কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন – তিনি কি ক্রয়সূত্রে মালিক, নাকি ওয়ারিশসূত্রে মালিক? তার নামে খাজনা খারিজ আছে কিনা, এবং তিনি যার কাছ থেকে জমি পেয়েছেন, তার মালিকানা কীভাবে এসেছে, সেটিও যাচাই করতে হবে। অর্থাৎ, জমির মালিকানার একটি সম্পূর্ণ চেইন আপনাকে দেখতে হবে। রেকর্ডীয় বা জরিপ খতিয়ান যার নামে হওয়ার কথা ছিল, সেই ব্যক্তির নামেই হয়েছে কিনা, এটিও খতিয়ে দেখা দরকার। অনেক সময় দেখা যায়, রেকর্ড ভুলভাবে অন্য কারো নামে হয়ে যায়, যা রেকর্ড ফেইল নামে পরিচিত। এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালিকানার চেইন সঠিক থাকলে এবং কাগজপত্র নির্ভুল হলে প্রথম ধাপটি সম্পন্ন হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: সার্চিং বা তল্লাশি
দ্বিতীয় ধাপটি হলো ‘সার্চিং’ বা তল্লাশি। এই ধাপে, আপনি বিক্রেতার কাছ থেকে যে মালিকানার কাগজপত্র বা ফটোকপি দেখেছেন, সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসের রেকর্ডের মিল আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। দলিল সঠিক আছে কিনা, সেটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মিলিয়ে দেখতে হবে। বিক্রেতার নামে যে খাজনা (খারিজি) রয়েছে, সেটিও ভূমি অফিস থেকে মিলিয়ে দেখতে হবে। রেকর্ডীয় জরিপ খতিয়ানগুলো ডিসি অফিস থেকে মিলিয়ে দেখা উচিত। অর্থাৎ, আপনার হাতে থাকা ফটোকপি কাগজপত্রগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাগজপত্রের হুবহু মিল আছে কিনা, তা তল্লাশি করে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। অনেক সময় নামজারি খতিয়ান, খাজনার রসিদ বা দলিল জাল করে নিয়ে আসা হয়। তাই এই ধাপটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করা উচিত।
তৃতীয় ধাপ: পেন্টাগ্রাফ অথবা সার্ভে করা
জমির মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার পর তৃতীয় এবং অত্যন্ত জরুরি ধাপ হলো ‘পেন্টাগ্রাফ’ অথবা ‘সার্ভে’ করা। এটি জমি কেনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা অনেকেই উপেক্ষা করেন। এই ধাপে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, আপনি কাগজে যে দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বরের জমি কিনছেন, সরেজমিনে সেই জায়গাটির দখল নিচ্ছেন কিনা। অনেক সময় দেখা যায়, দলিলে একটি দাগ নম্বর উল্লেখ থাকলেও, বাস্তবে ক্রেতাকে অন্য দাগ নম্বরের জমি দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, দলিলে ৫২৭ দাগের জমি থাকলেও, ক্রেতা দখল পাচ্ছেন ৫২৬ দাগের। এছাড়াও, সিএস দাগের সঙ্গে এসএ দাগের বা আরএস দাগের মিল না থাকার মতো ঘটনাও ঘটে। তাই জমি কেনার আগে অবশ্যই পেন্টাগ্রাফ বা সার্ভে করে নিশ্চিত হতে হবে যে, কাগজে বর্ণিত জমির অবস্থান এবং আপনি যে জমিটি দখল নিচ্ছেন, তা একই।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবং উল্লিখিত তিনটি ধাপ সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করার পরও কিছু অতিরিক্ত বিষয় খেয়াল রাখা উচিত। যেমন: জমিটিতে সরকারি কোনো স্বার্থ আছে কিনা, কোনো প্রকার বন্ধক (মর্টগেজ) আছে কিনা, বা বিক্রেতা আপনার কাছে বিক্রি করার আগে অন্য কারো কাছে জমিটি হস্তান্তর করেছেন কিনা। বর্তমানে এমন প্রতারণার ঘটনা অহরহ ঘটছে, যেখানে বিক্রেতা আপনার কাছে জমি বিক্রি করার আগেই তার নিকটাত্মীয়ের কাছে হেবা বা অন্য কোনো উপায়ে জমি হস্তান্তর করে দেয়। এক্ষেত্রে পূর্বের দলিলটিই আইনত কার্যকর থাকবে এবং আপনার দলিলটি বাতিল হয়ে যাবে, যার ফলে আপনি প্রতারণার শিকার হবেন।
অতএব, জমি কেনার সময় একজন দক্ষ দলিল লেখক বা আইনজীবীর মাধ্যমে দলিল প্রস্তুত করানো এবং উল্লিখিত সকল কাগজপত্র সঠিক প্রক্রিয়ায় যাচাই করে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলিলে কোনো ভুল থাকলে (যেমন: গর্বে, দাতা-গ্রহীতার নামে বা তফসিলে), তা সংশোধনের জন্য অনেক জটিলতা ও মামলা-মোকদ্দমার সম্মুখীন হতে হতে পারে।
Leave a Reply