আজকের আধুনিক জীবনযাপন আমাদের শরীরের ওপর ধীরে ধীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো জীবনধর্মী রোগের তালিকায় এখন নতুন একটি নাম দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে — হাঁটুর দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা। এক সময় যা শুধু বয়স্কদের সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ তা আক্রান্ত করছে তরুণ-তরুণী, অফিসে কাজ করা মানুষ এমনকি কিশোরদেরও। এটি এখন একটি নতুন জীবনধর্মী রোগে রূপ নিচ্ছে।
একজন অস্থি বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি লক্ষ করেছি, ৪০-এর নিচে অনেক রোগী হাঁটুর ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া বা চলাফেরায় অস্বস্তির অভিযোগ নিয়ে আসছেন। এই সমস্যার মূল কারণ হলো আমাদের জীবনযাপন — ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, শরীরচর্চার অভাব, ভুল ভঙ্গিতে বসা এবং স্থূলতা।
হাঁটুর যত্নে মনোযোগ না দিলে কী হতে পারে?
হাঁটু আমাদের শরীরের ভার বহনকারী গুরুত্বপূর্ণ জয়েন্ট। সারাদিন চলাফেরা, ওঠা-বসা—সবকিছুতেই হাঁটুর ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকার ফলে হাঁটুর রক্তপ্রবাহ কমে যায়, আশপাশের পেশিগুলি দুর্বল হয়, এবং ধীরে ধীরে গঠনের ক্ষয় হতে শুরু করে। এর ফলে দেখা দিতে পারে ব্যথা, ফোলা এমনকি অকাল অস্টিওআর্থ্রাইটিস।
আমাদের কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসই হাঁটুর ক্ষতি করছে:
১. নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন:
ওয়ার্ক ফ্রম হোম, টিভি বা মোবাইল স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানো – এগুলো হাঁটু চলাচল কমিয়ে দেয়। এতে পেশির শক্তি হ্রাস পায় এবং হাঁটু দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. ভুলভাবে ব্যায়াম:
অনেকেই ওয়ার্মআপ ছাড়া হাই-ইমপ্যাক্ট এক্সারসাইজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শক্ত মাটিতে দৌড়ানো, ভুল জুতা পরা, বা ব্যথা উপেক্ষা করে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া হাঁটুর আরও ক্ষতি করে।
৩. স্থূলতা:
ওজন বেশি হলে হাঁটুর ওপর চাপ অনেক গুণ বেড়ে যায়। এক কেজি অতিরিক্ত ওজন হাঁটুর ওপর প্রায় চার কেজি চাপ ফেলে। এর ফলে কার্টিলেজ ক্ষয় হতে থাকে। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি প্রদাহ তৈরি করে, যা অস্থিসন্ধির ক্ষয় ত্বরান্বিত করে।
৪. খারাপ ভঙ্গি:
ল্যাপটপ বা মোবাইলে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো আমাদের মেরুদণ্ড ও কোমরের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা হাঁটুর ওপর অসম চাপ সৃষ্টি করে এবং ব্যথার কারণ হয়।
হাঁটুর ব্যথা প্রতিরোধ করা সম্ভব – ছোট কিছু পরিবর্তনে:
- আরও নড়াচড়া করুন: ডেস্ক জব হলেও প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একবার হাঁটুন বা স্ট্রেচিং করুন।
- সঠিকভাবে ব্যায়াম করুন: কোয়াড্রিসেপস ও হ্যামস্ট্রিংসের মতো হাঁটুর পেশি শক্তিশালী করে এমন ব্যায়ামে মনোযোগ দিন।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: স্বাস্থ্যকর ডায়েট ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে BMI ঠিক রাখুন।
- সঠিক জুতা পরুন: এক্সারসাইজ বা হাঁটার সময় আরামদায়ক ও ঠিক মাপের জুতা ব্যবহার করুন।
হাঁটুর ব্যথা যদি এক মাসের বেশি সময় ধরে থাকে, হাঁটাচলায় সমস্যা তৈরি করে বা ফুলে যায় – তবে দেরি না করে একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। দেরি করলে চিকিৎসার সুযোগ কমে যায় এবং সমস্যার জটিলতা বাড়ে।
Leave a Reply